মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

নিরাপদ হোক সিএনজি সিলিন্ডার

রসায়নের ভাষায় জ্বালানি হিসেবে কার্যকারিতা নির্ধারণের অন্যতম নিয়ামক হলো ‘অকটেন নাম্বার রেটিং’। আর সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাসের (সিএনজি) ক্ষেত্রে এই অকটেন নম্বরের রেটিং ১৩০—যা কিনা জ্বালানি হিসেবে কার্যকারিতার দিক থেকে গ্যাসোলিনের থেকেও বেশি। সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পমূল্য হওয়ার দরুন বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় এই রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজি। আমাদের দেশেও তা নেহাত কম নয়। রাজধানীর কথাই ধরুন না। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের গণপরিবহন, ট্যাক্সিক্যাব, অটোরিকশা কিংবা হিউম্যান হলার—সব বাহনেই সিএনজি সিলিন্ডারের বিকল্প ভাবা যেন দায়। দুর্ভাগ্য, এই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কয়েকটি অসাধু চক্রের হাতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অননুমোদিত সিএনজি কনভারসন প্রতিষ্ঠান, এর সঙ্গে আছে অদক্ষ মেকানিকদের পাল্লায় পড়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনা। আর এসব জায়গা থেকে সেবা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে সাধারণ মানুষ। যার খেসারত দিতে হয়েছে জীবনের মূল্য দিয়ে। সম্প্রতি কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা যেন সেই অসচেতনতা ও অসাধুতার প্রতিচ্ছবি।
ঠিক কেন এই দুর্ঘটনা? কিংবা এর পেছনের কারণগুলোই বা কী? মুঠোফোনে কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিকৌশলে স্নাতক, বর্তমানে পেট্রিডেক এলপিজি ইন্ডাস্ট্রিয়ালের বিক্রয় ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া জালালের সঙ্গে। তাঁর কথায় উঠে এসেছে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ থেকে শুরু করে প্রতিকারের বিষয়গুলো। সঙ্গে পরামর্শ দিয়েছেন সিএনজি রূপান্তরের সময় কী কী বিষয়ে আমাদের লক্ষ রাখা উচিত কিংবা এই রূপান্তরের পরবর্তী সময়কার প্রয়োজনীয় যত্নের কথা।

যেসব কারণে ঘটে দুর্ঘটনা
দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ হলো নিম্নমানের কম পুরুত্ববিশিষ্ট সিলিন্ডার ব্যবহার করা। একই সঙ্গে পুরোনো অচল হয়ে যাওয়া সিলিন্ডারের পুনর্ব্যবহার—যেগুলো স্থানীয় গ্যারেজ কিংবা মেকানিকদের কাছ থেকে রূপান্তরের কাজ করানোর কারণে বাহ্যিকভাবে শনাক্ত করার উপায় থাকে না। অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে রূপান্তরের কাজ করালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই সরকার অনুমোদিত তথা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (সংক্ষেপে আরপিজিসিএল) স্বীকৃত কনভারসন প্রতিষ্ঠান থেকে অবশ্যই এই রূপান্তরের কাজ করানো উচিত। ওদিকে দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সিলিন্ডারে অনেক সময় খুব ক্ষুদ্র ক্ষয় হয়ে থাকে, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষায় বের হয়ে আসে। এই ক্ষয় থেকেও ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা।

সিএনজিতে রূপান্তরের সময় লক্ষ রাখতে হবে
* নিজের সাধের গাড়িটি সিএনজিতে রূপান্তরের সময় অবশ্যই লক্ষ রাখা উচিত, যে প্রতিষ্ঠান থেকে রূপান্তর করানো হচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানটি সরকার অনুমোদিত কি না।
* যে সিলিন্ডারটি কিনবেন, তা যে দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে, সেটা স্বীকৃত উপায়ে হচ্ছে কি না।
* প্রতিটি সিলিন্ডারের সঙ্গেই ওই সিলিন্ডারের নিজস্ব টেস্ট রিপোর্ট থাকে, যেটা কেনার সময় সবার উচিত সিলিন্ডারের নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে ওই টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহ করা এবং সব তথ্য মিলিয়ে দেখা।
* যে কনভারসন কিট দিয়ে সিএনজি রূপান্তর করা হবে, তা আন্তর্জাতিক নীতিমালা মেনে চলে কি না।
* যেসব কারিগর বা শ্রমিক এই রূপান্তরের কাজ করবেন, তাঁরাও আরপিজিসিএল থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কি না।

পরবর্তী যত্ন
যত্ন বলতে গ্যাস সিলিন্ডারের আলাদা করে খুব যত্ন নিতে হবে, তা কিন্তু নয়। তবে যেকোনো সিলিন্ডার চালু হওয়ার পর ন্যূনতম পাঁচ বছর পরপর একবার করে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে। যেটা আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেনে চলা হয় না। সে ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকলে তা পরীক্ষায় বের হয়ে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদি ওই সিলিন্ডার ব্যবহার করা সম্ভব হয়। খেয়াল রাখা উচিত, এই পরীক্ষা করানোর কাজও যেখান-সেখান থেকে না করিয়ে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে করানো শ্রেয়তর। আর একটি বিষয়, সিলিন্ডার সংশ্লিষ্ট কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই নিজে থেকে কোনো কিছু না বুঝে করে দক্ষ মেকানিকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

সিলিন্ডার পরীক্ষা না করালে ঘটতে পারে এমন দুর্ঘটনা

সিলিন্ডার পরীক্ষা না করালে ঘটতে পারে এমন দুর্ঘটনা

থাকুন সতর্ক
সাধারণত চলন্ত অবস্থায় দুর্ঘটনা ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হওয়ার ঘটনা বিরল। গ্যাস নেওয়ার সময় তথা রিফিল করার সময় এই ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে থাকে বেশি। দুর্ঘটনা এড়াতে তাই নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর সতর্ক নজর রাখা জরুরি।
* প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অনুমোদিত সিলিন্ডার রি-টেস্ট সেন্টার থেকে সিলিন্ডার পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া।
* সিলিন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির ফিটনেস টেস্ট নিয়মিত চেক করা।
* যে স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস রিফিল নেওয়া হবে, তার লেটেস্ট সেফটি চেক করা আছে কি না, তা জেনে নেওয়া।
* গাড়িতে গ্যাস নেওয়ার সময় অবশ্যই গাড়ি থেকে নেমে নিরাপদ দূরত্বে অপেক্ষা করা।
* গ্যাস নেওয়ার সময় স্টার্ট-কি খুলে রাখা।
* গ্যাস রিফিল করার আগে ভালোভাবে চেক করা কানেকশন ঠিক আছে কি না।
* বেশি গ্যাস নেওয়ার তাড়নায় কখনো ৩০০০ পিএসআইয়ের ওপর রিফিল না নেওয়া।
* গ্যাস সিলিন্ডারের কোনো কাজ করাতে গেলে অবশ্যই তা বাহন থেকে খুলে নিয়ে সম্পূর্ণ গ্যাস বের করে দিয়ে তবে কাজ করতে দেওয়া।
* সিএনজি গাড়িতে ধূমপান বা আগুন-সংশ্লিষ্ট কাজকর্ম থেকে বিরত থাকা।

prothom alo

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020 thebengalgazette
Design & Developed BY Freelancer Zone